নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও চলমান সংস্কার কাজ শেষ করে দ্রুত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে গণফোরাম। আর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল শনিবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সংলাপে এ সব দাবি তোলা হয়।
গণফোরামকে দিয়ে গতকাল শনিবার এ সংলাপ শুরু হয়। বেলা তিনটায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা একের পর এক রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সংলাপ করেন। গণফোরামের পর এলডিপির সঙ্গে সংলাপ হয়। এরপর জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, ১২ দল, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, লেবার পার্টি ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) আলোচনায় অংশ নেয়। এর আগে গত ৫ অক্টোবর বিএনপিসহ পাঁচটি দল ও তিনটি জোটের সঙ্গে সংলাপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা।
সংলাপ শেষে বেরিয়ে যমুনার সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাছে গণফোরামের সমন্বয় কমিটির সদস্যসচিব মিজানুর রহমান বলেন, বৈঠকে তারা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারসহ বেশ কিছু ব্যাপারে পরমার্শ দিয়েছেন। সরকার সেটা ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে বলে জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে সংবিধান, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেন কথা বলেছেন বলে জানান দলটির সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তফা মহসীন মন্টু। তিনি বলেন, সংলাপে বাজারে পরিস্থিতি নিয়ে জোর দিয়েছি। সিন্ডিকেটকে অবশ্যই ভাঙতে হবে।
মোস্তফা মহসীন বলেন, পতিত স্বৈরাচার ও তাদের বিদেশি এজেন্টরা বাংলাদেশটাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে, তাদের থেকে উদ্ধারের জন্য আমাদের সবাইকে জাতীয়ভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
গণফোরাম অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন চায় জানিয়ে মোস্তফা মহসীন বলেন, সবাইকে একমত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এ সরকার জনগণের সরকার। এ সরকারকে রক্ষার স্বার্থে; অর্থাৎ আমাদের নিজেদের রক্ষার স্বার্থে আগামী দিনে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হবে।
গণফোরামের এই নেতা বলেন, আমরা সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করব। তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) যেকোনো বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা চাইবেন। আমরা যেটা উপলব্ধি করব, সেটাই পরামর্শ দেব। জনগণের জন্য দরজা খোলা আছে বলে প্রধান উপদেষ্টা আমাদের বলেছেন।
নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে জানিয়ে মোস্তফা মহসীন বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন কমিশন করতে হবে। এটার জন্য সার্চ কমিটি বা কিছু করার প্রয়োজন আছে, ভালো লোক নিয়োগ দেওয়ার দরকার আছে। যাতে অতীতের মতো কোনো সমস্যা না হয়।
রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে মোস্তফা মহসীন বলেন, আমরা কোনো তারিখ উল্লেখ করিনি। বলেছি, সংস্কার শেষ দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার জন্য।
সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দুই-এক দিনের মধ্যে আলোচনা করে লিখিত আকারে দেব।
আটটি দিবস বাতিল করা হয়েছে, এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে মোস্তফা মহসীন বলেন, জাতীয় দিবস ছাড়া কোনো দিবসই রাখা উচিত নয়।
এই সংলাপে গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন গণফোরামের সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তফা মহসীন মন্টু, কো-চেয়ারম্যান এস এম আলতাফ হোসেন, সুব্রত চৌধুরী, সদস্যসচিব মিজানুর রহমান, সদস্য এ কে এম জগলুল হায়দার আফ্রিক, মহিউদ্দিন আবদুল কাদের, মোশতাক আহমেদ ও সুরাইয়া বেগম।
অপর দিকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সংলাপে তিনি তার দলের পক্ষে এ দাবি জানান।
সংলাপ শেষে অলি আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, তারা (আওয়ামী লীগ) তাদের পুলিশ বাহিনীকে (জনগণের বিরুদ্ধে) অবৈধভাবে ব্যবহার করেছে। তারা এক হাজার ৫০০ ছেলে-মেয়েকে হত্যা করেছে, আহত করেছে। তারা দেশকে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত করেছে।
এলডিপি প্রধান বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর জামায়াত নিষিদ্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞার কারণ কী ছিল? একই কারণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। তারা দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কট্টর সমর্থক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি জানান অলি আহমেদ।
আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত নির্বাচনের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতিবাচক মত দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ।
ববি হাজ্জাজ বলেন, ২০২৫ সালের জুন বা তার পর নির্বাচন সম্ভব বলে আমরা সংলাপে জানিয়েছি। ছয় কমিশনের প্রতিবেদন আসার পর আবারও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসবেন প্রধান উপদেষ্টা। এর আগে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনী রোডম্যাপের চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। উপদেষ্টা পরিষদের পরিধি বাড়ানোর বিষয়েও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনডিএম চেয়ারম্যান।
এদিকে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সংলাপ শেষে বাংলাদেশ লেবার পার্টির প্রধান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেছেন, মানুষের বোবা কান্না শোনার কেউ নেই। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছে। অন্তর্র্বতী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারকে অপসারণের দাবি জানিয়েছি। সেইসঙ্গে জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারেরও কথা বলেছি। এর আগে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে বসে গণফোরাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রতিনিধি দল।
অপরদিকে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেছেন, সংস্কার সংস্কারের মতো চলবে- এর মধ্যে একটা নির্বাচনি রোডম্যাপ দিতে বলেছি সরকারকে। সংস্কার কমিশনের কার্যক্রম ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন যমুনায় সংলাপ শেষে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। দ্রব্যমূল্য নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছি, আপনার টিম দিয়ে বাজার মনিটরিং করেন। এখানে সিন্ডিকেট আছে তা ভাঙার চেষ্টা করেন। বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নতি করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট। সংবিধান সংস্কারের মালিক জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার বলে বৈঠকে জানান জোটের নেতারা। ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, সংবিধানের মেজর পরিবর্তন করবে নির্বাচিত সরকার। আপনারা তা করবেন না। অর্থপাচারে জড়িত ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডি, পরিচালকদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানায় জোটটি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সংলাপ
সংস্কার সম্পন্ন করে নির্বাচনের আহ্বান
- আপলোড সময় : ২০-১০-২০২৪ ১২:৩৪:৫২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২০-১০-২০২৪ ১২:৩৪:৫২ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ